মব সন্ত্রাস ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ?

প্রশ্ন হলো, কেন এ মব সন্ত্রাসের মহামারি হলো?
ড. ইউনূস বা তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা এর জন্য আদৌ দায়ী কি না?
প্রথমেই খতিয়ে দেখা যাক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কেন মব সন্ত্রাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে নির্বিচার হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। থানা আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ হত্যা করা হয়েছে। থানা থেকে অস্ত্র-গোলাবরুদ লুট হয়েছে। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল নাকি পরিকল্পিত? এ প্রশ্নের জবাব ইউনূস নিজেই দিয়েছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রতিষ্ঠান ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ’-এর একটি আয়োজনে অংশ নেন তিনি। সেখানেই অধ্যাপক ইউনূস বলেন, মেটিকুলাসলি ডিজাইন করা আন্দোলন। সেখানে তিনি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাহফুজকে পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ইউনূসের এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে ৫ আগস্ট-পরবর্তী মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হামলা, লুটপাটের ঘটনাগুলো ছিল সুপরিকল্পিত। অথচ একটি সফল আন্দোলনে বিজয়ের পর এ ধরনের নৈরাজ্য কাম্য ছিল না। বাংলাদেশের আগেই শ্রীলঙ্কায় সরকারের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থান হয়েছিল। জনতার ঢল নেমেছিল রাজপথে। কিন্তু কোথাও লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। ঘটেনি কোনো হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের পর নেপালেও জেন-জিদের নেতৃত্বে আন্দোলনে সরকার পতন হয়। কিন্তু সরকারের পতনের পর সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নেপালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ৫ আগস্টের পর পরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছিল। কেন এটা করা হয়েছিল তা স্পষ্ট হয়ে যায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসার পর। ইউনূস চেয়েছিলেন দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে, যেন তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেন। এ কারণেই ৫ আগস্ট-পরবর্তী সব মব সন্ত্রাসের দায় সরাসরি মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর বর্তায়।
আমরা যদি ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকাল পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব তিনি ভয় এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। আর এটা করেছিলেন তাঁর নিজস্ব মব বাহিনী দিয়ে। নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। কিন্তু ইউনূসের ক্ষমতার উৎস ছিল বলপ্রয়োগ, মব সন্ত্রাস। অনেক কাজই ইউনূস সরকার বৈধ আইনি পন্থায় না করে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে করেছে। যেমন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের পদত্যাগ। একটি সুস্থ রাষ্ট্রে এভাবে একযোগে প্রধান বিচারপতিসহ বিচারপতিদের পদত্যাগে বাধ্য করা অকল্পনীয়। ইউনূস চাইলে এটি সাংবিধানিক উপায়ে সুন্দরভাবে করতে পারতেন। তখন তিনি দেশের অবিসংবাদিত নেতা। তিনি বিচারপতিদের ভদ্রভাবে বলতে পারতেন। কারণ এখন জানা যায়, ওই সময় প্রধান বিচারপতি সেনা আশ্রয়ে সেনানিবাসে ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের সামনে মব করিয়ে ইউনূস আসলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরেছিলেন। এর ফলে বিচারপতিরা স্বাধীনভাবে বিচারকাজ করতে ভয় পেতেন। সম্প্রতি আইনজীবী সারা হোসেন এ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, বিচারপতিরা এখন জামিন দিতে দশবার চিন্তা করেন। একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত যখন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না তখনই সেই রাষ্ট্রে মব রাজত্ব কায়েম সহজ হয়। আমরা ইউনূস শাসনামলে দেখেছি, আইনের শাসন বলে কিছু ছিল না। যাকে ইচ্ছা হয়েছে মব লেলিয়ে দিয়ে তাকে প্রথমে হেনস্তা করা হয়েছে, পরে জেলে ঢোকানো হয়েছে। বর্তমানে কারাগারে থাকা শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, অনুমিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের আটক রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। একদিকে যেমন উচ্চ আদালতে মব করে বিচারকদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, অন্যদিকে আদালতপাড়ায় মব করে আসামিদের আইনগত অধিকার হরণ করা হয়েছে। এভাবেই আইনের শাসনের পথ রুদ্ধ করে মব সন্ত্রাসের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। এজন্য অবশ্যই দায়ী ড. ইউনূস এবং তাঁর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
একটি সরকারের প্রধান কাজ হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইউনূস সরকার দেড় বছর জনগণের জীবনের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা তো করেনইনি, বরং জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে মবের কাছে জিম্মি করেছেন। জনগণ যেন তাদের অধিকারের কথা বলতে না পারে সেজন্য মব দিয়ে তাদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে।
ইউনূস সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা। এজন্য তিনি বেসরকারি খাতের ওপর বুলডোজার চালিয়েছেন। মব দিয়ে কলকারখানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারখানায় আক্রমণ চালানো হয়েছিল। এসব কোনো ঘটনাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলার কয়েক ঘণ্টা পরও পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি। বেসরকারি খাতকে দুর্বল করে ইউনূস দেশকে দাতানির্ভর করতে চেয়েছিলেন। এ কারণেই তাঁর শাসনামলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম চুক্তি হয়েছে। আইএমএফের খবরদারি বেড়েছে।
ইউনূস সরকারের একটি বড় এজেন্ডা ছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা। এ কারণেই শিক্ষাঙ্গনে লেলিয়ে দেওয়া হয় মব বাহিনী। শিক্ষকদের হেনস্তা করার মতো জঘন্য ঘটনা নির্বিচারে হয়েছে ইউনূস আমলে।
ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল ছিল স্বেচ্ছাচারিতা এবং অনিয়মের এক কালো অধ্যায়। দেশের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধেও মব বাহিনী ব্যবহার করেন ড. ইউনূস।
আর তাঁর সব অপকর্মের কথা যেন প্রকাশিত না হয় সেজন্য দায়িত্ব নিয়েই তিনি গণমাধ্যমকে মব দিয়ে শায়েস্তা করেন। শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন হত্যা মামলা দায়ের করে, মব বাহিনী দিয়ে সংবাদপত্র অফিসে হামলা করে, ভিন্নমতের সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করে ইউনূস গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, ইউনূসের সময়ে এসব মবের ঘটনার বিচার হয়নি। সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে থানায় মামলা পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। আর এ কারণেই গত দেড় বছরে সব মব সন্ত্রাসের দায় ইউনূসের। ড. ইউনূস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। আর তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অস্ত্র ছিল মব বাহিনী। এটাই শান্তির দূতের একটি মেটিকুলাস ডিজাইন।
নিইজ সংগ্রহ বাংলাদেশ প্রতিদিন
