উপ-সম্পদকীয়
-মাহমুদুল বাসার
রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের পান থেকে চুন খসলে বিরাট আকার ধারণ করে। প্রযুক্তির বদৌলতে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে নেতা-নেত্রীদের আরামের ব্যাঘাত ঘটলে। অথচ শিয়াল-কুকুরের মত অসহায়ভাবে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এতে কারো কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তথাকথিত বিশ্ববিবেকেরও কোন প্রতিক্রিয়া নেই। ‘এ্যামনেস্টি’ ‘মানবাধিকার’ ‘সুজন’ ইত্যাদি সংগঠনগুলো কি কানে তুলো আর পিঠে কুলো বেঁধেছে? মানুষের চিৎকার, আহাজারি, আর্তনাদ তাদের স্পর্শ করে না? সাধারণ মানুষের অপরাধ কী? তাওতো তারা বলছে না? সরকার পতনের নামে এসব কী হচ্ছে? এস.এস.সি পরীক্ষার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরের পরীক্ষা চরম অনিশ্চতার মুখে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা পড়েছেন চরম টেনশনের মধ্যে। রোজ পথে নামছে শিক্ষার্থীরা, ‘আমরা মরতে চাই না’, ‘আমরা স্কুলে যেতে চাই’, ‘আমাদের পথ চলা নিরপদ কর’ আমাদের পেট্রোল বোমা মেরো না’ ইত্যাদি শ্লোগান লেখা ব্যানার হাতে নিয়ে।
এস.এস.সি পরীক্ষার সময় অবরোধ বহাল রাখার পাশাপাশি হরতাল পালনের ঘোষণা দেয়ায় দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। হরতাল, অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের প্রবশে সড়কে মানব বন্ধন করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক সহ সর্বস্তরের মানুষ বি.এন.পি-জামায়াত জোটকে অবরোধ ও হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলছেন, ‘আমরা পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ চাই, রাজনীতির নামে সহিংসতা ও বোমাবাজি চাই না।’ পরীক্ষার্থীরা আকুল আবদেন জানান- আমাদের বোমা মেরো না, আমরা নিরাপদে পরীক্ষা দিতে চাই। অভিভবাক-শিক্ষকরা বলেছেন, অবরোধের নামে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারা ও হরতালের নামে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া কোন সভ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। প্রায় ত্রিশটির অধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করে এই বর্বর রাজনৈতিক প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও প্রেসক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করেছে চলমান অবরোধ-হরতালের নামে সহিংসতার বিরুদ্ধে। খালেদা জিয়ার কার্যাালয়ের সামনে রাজধানীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা ভেঙ্গে পড়েছে,্ আকুল আর্তনাদ জানাচ্ছে যে, খালেদা জিয়া যেন অবরোধ প্রত্যাহার করে এস.এস.সি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দেন। ২রা ফেব্র“য়ারী থেকে শুরু হওয়ার কথা এস.এস সি.পরীক্ষা, তার পরিবর্তে শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে । এবার ১৪ লক্ষ ৮০ হাজার পরীক্ষার্থী এস.এস.সি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ ফের হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। হরতাল অবরোধের মধ্যে সারাদেশে এস.এস.সি পরীক্ষর্থীদের জন্য যৌথ নিরাপত্তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে সার্বিক নিরাপত্তা দেবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের আইজি।
১লা ফেব্র“য়ারী থেকে শুরু হয়েছে বইমেলা। এটি সমগ্র বাঙালি জাতির একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বের বাঙালি সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে বই মেলার নান্দনিক প্রভাব। কিন্তু বইমেলার প্রাণের স্পন্দন কি এবার অফুরন্ত, সাবলীল থাকবে? সচিবালয়ের সামনে বোমা ফাটানো হয়েছে, বই মেলায়ও কি বোমা ফাটাতে পারে না? বাংলা বাজারে গিয়ে বই প্রকাশক ও ব্যবসায়ীদের মুখ দেখেছি গভীর চিন্তিত। সমগ্র জাতির মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। আতঙ্কের শিকারে পড়ে জাতির সৃজনী শক্তি কুকড়ে যাচ্ছে। কোন একটি ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ স্বস্তির মধ্যে নেই, অস্বস্তি, আতঙ্ক, ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা, জীবনের মায়া তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে- হরতালে চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে মরতে হবে, চাকুরির স্থলে যাওয়ার পথে বোমা বাজির শিকার হতে হবে, বই মেলার মত একটি স্বত:স্ফূর্ত সাংস্কৃতিক উৎসবে আসার পথে আগুনে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা মাথার ওপর ঝুলছে। বাংলাদেশ আতঙ্কের কারাগারে বন্দী। এই আতঙ্ক যে শুধু কোন দল বা জোট তৈরি করেছে তা নয়, এটা তৈরি করেছে ১৯৭১ এর বৈরি দর্শন। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী এবং পাককালচার পন্থীরা ছিলো সর্বৈব ভাবে বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী। বাঙালির নামে তারা মূর্ছা যেতো। বাঙালি জাতিকে তারা ভাবতো অমুসলমান-পৌত্তলিক। বাংলা ভাষাকে তারা ভাবতো হিন্দুদের ভাষা। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে তারা ভাবতো পূজা করা। রবীন্দ্রনাথ ছিলো তাদের চক্ষুশূল। পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনকালে রবীন্দ্র সাহিত্য রক্ষার জন্য বাঙালিকে স্বতন্ত্রভাবে আন্দোলন করতে হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর একটা দুঃসময়ে পাকিস্তানি সামন্তবাদী, মৌলবাদী ভাবধারা নতুন বেগে খাড়া হয়ে উঠেছিলো। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের সেকুলার-মানবিক-লোকতান্ত্রিক দর্শনকে ন্যাক্কারজনক ভাবে বির্তকিত, পর্যদুস্ত করা হয়েছে। এই সে দিন হেফাজতের ১৩ দফা বাঙালি সংস্কৃতির উৎখাতের আবদার জানিয়েছে। শহীদ মিনার ভেঙে দেবার, স্বাধীনতার ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেবারও আবদার জানিয়েছে। সেই ভাবধারার উৎসমূল থেকে আজকের অবরোধ চলছে। যে অবরোধের শিকার হয়ে বাঙালির অব্যাহত অগ্রযাত্রা খান খান হয়ে যাচ্ছে। জঙ্গী-তালেবান-মৌলবাদ যেমন পাকিস্তানকে অন্ধকারের অতলে ঠেলে দিয়েছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নেত্রী বেনজীর ভূট্টোকে হত্যা করেছে, পাকিস্তানকে ওয়াজিরিস্তানে রূপ দিয়েছে, আমেরিকার চিরস্থায়ী ক্রীতদাস বানিয়েছে; বাংলাদেশকেও অবরোধ-হরতাল দিয়ে বোমাবাজি করে অনুরূপ মধ্যযুগের অন্ধকার রাষ্ট্রে রূপ দিতে চায়।
আজকের এই অবরোধের ভয়ঙ্কর মুহূর্তে চাপাইনবাবগঞ্জের বাংলাভাইদের দাপটের কথা মনে পড়ছে, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিষাক্ত ওয়াজের কথা মনে পড়ছে। সংসদে দাঁড়িয়ে সাঈদী সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর ‘লাল সালু’ উপন্যাসের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছে। তার আঙ্গুলের ইশারায় এই বইমেলায় জঙ্গীরা ড: হুমায়ুন আজাদকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে ফালা ফালা করেছে। এই অবরোধের বেষ্টনীতে দাঁড়িয়ে গভীর বেদনার সঙ্গে মনে পড়ছে ১৭ আগষ্টে একযোগে সারাদেশে বোমাবাজির কথা, বিচারক হত্যার কথা, বিচারালয়ে বোমা নিক্ষেপের কথা। মনে পড়ছে ২১ আগস্টের গ্রেনেড নিক্ষেপের তান্ডব লীলায় জননেত্রী আইভি রহমান সহ ২৪জন মানুষের করুন মৃত্যু এবং শত শত মানুষ আহত হওয়ার কথা। সেদিন শেখ হাসিনা কোন রকম প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন ।
আজো অবরোধের নামে, হরতালের নামে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকেই অবলীলায় হত্যা করছে। পেশাদার বোমাবাজরা, জঙ্গী জে.এম.বি, বাংলা ভাইরা বেগম জিয়ার নাম নিয়ে তারাই ক্ষমতায় যেতে চায়। এখনো পর্যন্ত সরকার ধৈর্য হারিয়ে অবরোধকারিদের গুলি করে হত্যা করেনি; কিন্তু পেশাদার বোমাবাজরা অগণিত সাধারণ লোক হত্যা করে যাচ্ছে। এটাকে জেনোসাইড বললে ভুল বলা হবে না।
যারা এই গণহত্যাকে আড়ালে আবডালে কৌশলে মদদ দিচ্ছেন, তারা ইতিহাসের আদালত থেকে রেহাই পাবেন বলে মনে হয় না।
