‘কলম বন্ধের কৌশল’ হিসেবে হত্যা মামলা

ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব মেটানো, প্রতিশোধ নেওয়া কিংবা সমালোচনামূলক কলম থামিয়ে দিতেই সাংবাদিকদের হত্যা মামলার আসামি বানানো হচ্ছে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এসব বানোয়াট মামলার কারণে প্রকৃত নিহতদের পরিবারও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে হত্যা মামলা দায়েরের ঘটনা উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সুযোগ হিসেবেই এসব মামলা ব্যবহার করা হচ্ছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে রাজধানীর কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দূরের একটি উপজেলার সাংবাদিককেও আসামি করা হয়েছে।
মনজিল মোরসেদ আরো বলেন, অধিকাংশ মামলাই এমন তথ্যের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে, যা আদালতে প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে দুটি বড় ক্ষতি হচ্ছে। প্রথমত, প্রকৃত নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে, কারণ ভুল বা কাল্পনিক আসামিদের নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারকে ছাড় দিচ্ছে। তাদের অপরাধের বিচার করছে না। তবে এমন একসময় আসবে, যখন তাদেরও বিচার হবে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে হত্যা মামলা দেওয়ার প্রবণতাকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাইদুর রহমান আরো জানান, শুধু মামলাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার তথ্য তাঁদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং খুব শিগগির এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ঢালাও মামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর বড় ধরনের হস্তক্ষেপ।
এ পরিস্থিতিতে আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে এসব মামলা দ্রুত প্রত্যাহারের আহবান জানান তিনি।
তবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, অতীতে দেশের কিছু সাংবাদিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ‘ফ্যাসিবাদী’ আচরণকে সহায়তা করেছিলেন। বিভিন্ন সময় কিছু সংবাদ ও বয়ানের মাধ্যমে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংস পরিবেশ তৈরিতেও কেউ কেউ ভূমিকা রেখেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাঁর পেশা বিবেচ্য হতে পারে না। সাংবাদিক, আইনজীবী বা অন্য যেকোনো পেশার মানুষই হোন না কেন, অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি এটিও মনে করেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে মামলায় জড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা ছাড়া ঢালাওভাবে মামলা দেওয়াকে তিনি নীতিবিরুদ্ধ ও অন্যায় বলে মন্তব্য করেন।
মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, যে ব্যক্তি যে অপরাধ করেছে, তার বিরুদ্ধে সেই অপরাধের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি সাংবাদিক, আইনজীবী কিংবা পুলিশ যেই হোন না কেন, অন্যায়কে অন্যায় এবং অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে।
