মাহমুদুল বাসার-
প্রয়াত কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী একজায়গায় বলেছেন, ‘সমাজ যখন দুর্বলকে অত্যাচার করে সবলের আত্মপ্রতিষ্ঠার সহজ পথ বেছে নেয়; তখন আমি কবিতায় তার প্রতিবাদ করি।’ (সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি – সোহরাব হাসানের কাছে খোলা চিঠি)।
বাক্য দুটো পড়ার পর আমার মনটা নতুন চেতনায় সজাগ হয়ে উঠলো। সমাজে আমিও একজন দুর্বল মানুষ। দুর্বলতাই নাকি ‘পাপ’, বলেছেন একজন ধর্মবেত্তা ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী। এ কথার তাৎপর্য আমার মত দুর্বলেরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
কত মতবাদ পৃথিবীতে আসলো, দুর্বলকে সবলের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলো না। একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি প্রায়ই আমাকে বলতেন, ‘আইন কানুন, আদালত, উকিল- মোক্তার, পুলিশ – দারোগা, মন্ত্রী-মিনিস্টার সবই সবলের পক্ষে; দুর্বলের বিপক্ষে।’
আমার মত দুর্বলেরা হাড়ে হাড়ে জানে, উপরের কথাগুলো কর্তটা নিরেট সত্য। জনগণও নিবৃাচনে ভোট দেয় সবলকে, দুর্বল – সৎ ব্যক্তিকে দেয় না। বলে যে, দুর্বল ভদ্রলোকের কী দাম আছে? সত্যিই তাই। সমাজ শক্তির পূজারি। তাই বোধ করি মহামতি মার্কস দুর্বল প্রোলতারিয়েৎ কে সবল করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি শ্রেণীহীন সমাজের পক্ষে আমৃত্যু কলম চালিয়ে গেছেন। কিন্তু কাজটি যে মহাকঠিন তা প্রমাণিত হয়েছে।
সারা জীবন আমি যে দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করলাম, লাঞ্ছিত হলাম, চাকুরি খোয়ালাম, সেই দলের মধ্যেই মাৎসন্ন্যায়। অর্থাৎ বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়। অথচ সবল আত্ম প্রতিষ্ঠার পথ পেয়ে যায়, গজদন্ত মিনার গড়ার সুযোগ পায়, টাকার নৌকা পাহাড়ে চালাবার সুযোগ পায়, প্রশাসন বোগল দাবা করার সুযোগ পায়, রাষ্ট্রযন্ত্র নিজের মুঠিতে নেবার সুযোগ পায়। আমার মত হাবাগোবা দুর্বলেরা দিশেহারা, হতভম্বের মত চারদিকে কেবল তাকায়। ডারউইনের কথা কি কোনদিন মিথ্যা হবে? তিনি বলেছেন, ‘লাঠির জোরই বড় জোর (যোগ্যতমের উদ্বর্তন ঘটে)। অবশ্য জোরের আরো রকম ফের আছে। যেমন- কৌশলের জোর, মেধার জোর, এলাকার জোর। সব জোরের লক্ষ্য একটাই। তাহোল, সবলকে স্বার্থ সিদ্ধির পথ খুলে দেয়া, তার জন্য দুর্বলকে পদদলিত করতে কোন বাধা নেই।
আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মুখ্য দাবি ছিলো শোষণ থেকে মুক্তি। শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন ছিলো আমাদের জাতির জনকের। তিনি তার দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। সাড়ে তিন বছর তিনি এই পথে হেঁটেছিলেন। তার এই হাঁটার অভিজ্ঞতা মর্মান্তিক, রক্তাক্ত। মারাত্মক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। তার নিজস্ব পরিমন্ডলের মধ্যে শোষক এবং শোষিত আলাদা হয়ে গিয়েছিলো। জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি, ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত, এক ভাগে শোষক, অন্য ভাগে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’
এই ঘোষণা মোটেও আবেগ সর্বস্ব ছিলো না, ছিলো অভিজ্ঞতা নিংড়ানো। তিনি মোকাবেলা করছিলেন আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় শোষক, যেমন মার্কিন, পাকিস্তান ও আরব বিশ্বের কিছু কিছু রাষ্ট্র। তারা চাচ্ছিলো বাংলাদেশের কোমর ভেঙে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বেকায়দায় ফেলে প্রতিশোধ নিতে। তখনকার বিশ্বে বঙ্গবন্ধু চীন-পাকিস্তান-মার্কিন ও আরব বিশ্বের প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত।’
শেখ ফজলুল হক মনি ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় ‘দূরবীনে দূরদর্শী’ নামে যে কলাম লিখতেন সেখানে দেশীয় শোষকের, লুটেরাদের একটি চিত্র এঁকেছিলেন। এরা বঙ্গবন্ধুর ক্রেডিবিলিটি চুষে খাওয়ার জন্য কালো হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি বিদেশ থেকে গরিব বাঁচানোর জন্য ভিক্ষে করে আনি, আর চাটার দল তা চেটে খায়। সবাই পেয়েছে সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’
তখন বয়েসে ছোট হলেও বঙ্গবন্ধুর বুকভরা বেদনার আর্তি আমি বুঝেছিলাম। তখন শোষক ও কলাবোরেটররা এক হয়ে গিয়েছিলো। এ ভাবে ‘৭৫ এর হত্যাকান্ডের পর প্রতিবাদ না হবার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিলো। কোলাবোরেটররা পাকিস্তানের চানতারা পতাকা হাতে রাস্তায় নামার সুযোগ পেয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার আমলেও ভেতরে ভেতরে নব্য শোষক পাল সৃষ্টি হয়েছে, যারা লালন ফকিরের ভাষায় ‘একদল বোম্বেটে খেলো সব লুটে পুটে।’ এই বোম্বেটের দল এখন স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারি দলটির ভেতরে ভয়ঙ্কর দশানন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দশাননের অর্থাৎ রাবনের দশমুখ। দশমুখ দিয়ে শোষণ করছে তারা শেখ হাসিনার ক্রেডিবিলিটি। তারা এখন দলের খুঁটি নয়, জোঁক। জোঁকের নেশা রক্তশোষণ করা। আর ত্যাগীদের নেশা হলো দলের জন্য বুক পেতে দেয়া, দলের খুঁটি হিসেবে কর্তব্য পালন করা। এই সব বোকার স্বর্গে বসবাসকবারি-ত্যাগীরা এখন নব্য শোষকদের কেনুর আঘাতে কাৎ হয়ে পড়ে আছে। যখন দলের দুর্দিন আসবে তখন বোম্বেটেরা ঘরে দরোজা দেবে, শোষিত-ত্যাগীরা উঠে দাঁড়াবে, দলের জন্য বুক পেতে দেবে। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছেন, ‘সমাজে একদল চিরকালই প্রদীপ মাথায় মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সভ্যতার পিলসুজ জ্বালাবার জন্য।’ এটাও তাই, ‘সিন্নি দেখলে মোন্তার মা আর বিপদ দেখলে আমরা না।’
পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ বাক্য, ‘লিভ এ্যান্ড লেট লিভ।’ ‘নিজে বাঁচো, অপরকেও বাঁচতে দাও।’ স্ব স্ব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই এই নীতি-নৈতিকতার প্রভাব শেকড় মেলাতে পারেনি, তাহলে সমাজে ও রাষ্ট্রে কেমন করে এই প্রভাব শেকড় মেলবে? আমাদের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ দমনের ট্রাডিশন আছে, কিন্তু দুর্বৃত্ত দমনের কোনো ট্রাডিশন নেই। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘গাছ পাথর’ কলামে একবার বলেছিলেন, ‘বাপ সকলেরই আছে, তাই বলে সকলেই কি ‘বাপের বেটা’ নাকি?’ হ্যাঁ, তাইতো, বাপের বেটাতো লাঠিয়ালরা, দুর্বৃত্তরা। এটাই নিয়ম যে, মাঠে প্রতিপক্ষ না পেলে নিজ দলের মধ্যে প্রতিপক্ষ তৈরি হয়, শোষক তৈরি হয়, ‘বাপের বেটা’ অর্থাৎ দুর্বৃত্ত তৈরি হয়। দুর্বত্তরা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে না, দলের শরীরে পুষ্টি যোগান দেয় না, দলের ইমেজের কথা ভাবে না, দলের সুনামের কথা, দল মজবুত করার কথা ভাবে না। তাদের কারণে দল ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকে। তারপর কর্মী শূন্য হতে থাকে। এর পর জোরে বাতাসে লাগলে ধপাস করে পড়ে যায়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সেই পথ লক্ষ্য করে হাঁটছে কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। ‘একদল বোম্বেটে’ হটিয়ে যদি ত্যাগীদের সামনে টেনে আনা না হয়, তাহলে বিপদ আসন্ন। অতএব সাধু সাবধান।
মাহমুদুল বাসার
প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক,
গবেষক
