সাইফুল ইসলাম, হাজীগঞ্জ ঃ
চট্টগ্রামের কাঁচা বাজারগুলোতে শীত মৌসুমে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ৫নং সদর ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামের বিখ্যাত কুমড়া বিক্রি হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেও শুধুমাত্র ব্যক্তি উদ্যোগে চাষকৃত কুমড়াসহ শাস-সবজি উৎপাদন করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করছে। গত কয়েক বছর ধরে অলিপুরে যে হারে সবজি উৎপাদন হচ্ছে যা চাঁদপুরের সুনাম কুড়িয়ে আনছে। শুধুমাত্র শীত মৌসুমে এ এলাকায় প্রায় ১০ লাখ কুমড়া উৎপাদিত হয়। এ কুমড়া উৎপাদন করতে গিয়ে কোন ধরনের কীটনাশক বা কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হয় না বলে ক’জন চাষী জানায়।
সরজমিনে অলিপুরে গেলে দেখা যায়, প্রতিদিন এলাকার জমি থেকে তুলে এনে হাজার হাজার কুমড়া সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। ভাল ফলনের কারণে এ এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কুমড়ার স্তূপ পাইকারী দামে কিনে নেন স্থানীয় বেশ কিছু ব্যবসায়ী। এরাই ট্রাক ভাড়া করে কুমড়া নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। চট্টগ্রামে পাইকারী বিক্রি শেষে আবার ট্্রাক নিয়ে ফিরতে না ফিরতে আবার অন্যান্য কৃষকরা ফের কুমড়া জমিয়ে স্তূপ করে রাখতে দেখা যায়।
হাজীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ডাকাতিয়ার কোল ঘেঁষা গ্রামগুলো হলো উচ্চঙ্গা-অলিপুর, উচ্চঙ্গা-দক্ষিণ, অলিপুর, দক্ষিণ বলাখাল, শমেশপুর আর চাঁদপুর সদর উপজেলার মনিহার-কামরাঙ্গা। এ গ্রামসমূহের কৃষকরা সাধারণত ইরি-বোরো মৌসুম ব্যতীত সকল সময়ে তরকারির আবাদ করে থাকেন। এর মধ্যে মুলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধা কপি, আলু, সিম, কুমড়া, শসা, ক্ষিরাই অন্যতম। তবে এবারে এ এলাকাসমূহে ব্যাপক ফলন হয়েছে কুমড়া আর লাউয়ের। আবার এ দুটির মধ্যে বেশি চাষ হয়েছে কুমড়ার।
প্রায় ২০ বছর ধরে নিজের জমিতে কুমড়া চাষ করছেন দক্ষিণ বলাখাল এলাকার আবুল খায়ের খান। তিনি জানান, এবারে আমি প্রায় ১শ’ ২০ শতাংশ জমিতে কুমড়া চাষ করেছি। প্রথম দু ধাপে ১৪ হাজার টাকার কুমড়া পাইকারী বিক্রি হয়েছে। তবে অন্যবারের চেয়ে এবারে দামটা একটু কম। কুমড়া চাষের বিষয়ে আবুল খায়ের আরো বলেন, কুমড়া চাষে খরচ তেমন একটা হয় না। তবে কচুরিপানার মূল জমাতে গিয়ে দিনমজুরের খরচাই বেশি হচ্ছে। সার সামান্য পরিমাণ দিলেই হয়। তবে কোনো ধরনের কেমিক্যাল বা কীটনাশক কুমড়ার গাছে দিতে হয় না।
কৃষক আবুল খায়ের এবার আশা করছেন তার জমিতে ইরি ধান লাগানোর আগেই প্রায় অর্ধ লক্ষ টাকার কুমড়া বিক্রি করা সম্ভব হবে। উচ্চঙ্গা এলাকার মিজি বাড়ির আঃ লতিফ বলেন, বলাখাল-অলিপুর-উচ্চঙ্গা এলাকায় প্রায় ১ হাজার একর জমিতে এবার কুমড়া চাষ হয়েছে। এ জন্য কৃষি অফিস থেকে কুমড়া চাষের উপরে কোনো ধরনের দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। পর্যাপ্ত পরামর্শ পাওয়া গেলে আরো ভালো মানের কুমড়া উৎপাদন করা সম্ভব হতো।
আঃ লতিফ আরো বলেন, আমরা সাধারণত আইডিয়ার মধ্যে কেজি প্রতি ১০/১২ টাকা হলেই কুমড়া বিক্রি করে দেই। এভাবে প্রতিটি কুমড়া ৩ কেজি হলে এর বিক্রি দাম দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়।
অলিপুর এলাকা থেকে পাইকারী কুমড়া কিনে ট্রাক ভাড়া করে চট্টগ্রামে নিয়ে বিক্রি করেন এমন একজন ব্যবসায়ী জানান, প্রায় ৩ কেজি ওজনের একটি কুমড়া কৃষক থেকে গড়ে ৩৫ টাকায় কিনে নেই। যা চট্টগ্রামে নিয়ে বিক্রি হয় ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। এর মধ্যে সকল ব্যয় ধরা হয়ে থাকে। ওই ক্রেতা আরো বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাইকারী বাজারের আড়তদারের কাছে আমরা শ’হিসেবে কুমড়া বিক্রি করে দেই। এভাবেই সপ্তাহে আমরা প্রায় ৪ বার কুমড়া নিয়ে চট্টগ্রামে যাই। প্রতিটি ট্রাকে করে প্রায় ৩০ হাজার পিচ কুমড়া নেয়া সম্ভব।
উপজেলা কৃষি অফিসার আমানুল ইসলাম বলেন, আমরা পরামর্শ দিয়ে তাদের সহযোগিতা করে থাকি। এর বাইরে আর কোনো কিছু করার নেই। তবে তারা যে হারে সবজি উৎপাদন করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করছে এতে কিছুটা হলেও সবজির ঘাটতি পুরন হচ্ছে। হাজীগঞ্জ উপজেলার অলিপুরের কৃষক যে ভাবে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালবেসে ও নিজে উপকৃত হওয়ার জন্য সবজি চাষাবাদ করে যাচ্ছে। তেমনি করে অন্যান্য উপজেলা গুলোতেও সবজি চাষ হলে দেশের অনেকটাই চাহিদা পূরণ হতো। ঘাটতি থাকতো না সবজির। বাড়তি দামে ক্রেতাদের সবজি কিনতে হতো না।
