মুহাম্মদ আরিফুর রহমান
প্রত্যেক মুসলমান রমজান মাসের আগমনে আনন্দিত হয়। যখন রমজানের আগমন হতো, তখন মহানবী (সা.)ও অনেক আনন্দিত হতেন। রমজানের শুরুতে তিনি বিশেষ খুতবা দিতেন। তিনি বলতেন, ‘তোমাদের কাছে বরকতময় মাস রমজান এসে গেছে। এ মাসে আল্লাহ তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারগুলো খুলে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত, যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে সমূহ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। ’ (নাসায়ি, হাদিস ২১০৫) এ ছাড়া এ মাসের আরো বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
ফরজ রোজার মাস রমজান : ফরজ রোজার মাস হলো রমজান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছে তোমাদের আগের লোকদের ওপর, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
কোরআন নাজিলের মাস রমজান : রমজানের মূল পরিচয় হলো, এ মাসে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস, এতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
রমজানে জান্নাত, জাহান্নাম ও শয়তানের অবস্থা : রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় ও জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় শয়তানদের। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘শয়তানদের শিকল পরানো হয়। ’ (মুসলিম, হাদিস ২৫৪৭)
রমজান মাসে শবেকদর : শবেকদর রমজানে অবস্থিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপো উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত। ’ (সুরা আল-কদর, আয়াত : ৩-৫)
রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস রমজান হলো দোয়া কবুলের মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘(রমজান মাসে) প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়। ’ অন্য হাদিসে এসেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। (মাজমুউ মুআল্লাফাতিল আলবানি, হাদিস ১০০২)
রমজান পাপ থেকে মা লাভের মাস যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপগুলো মা করানো থেকে বঞ্চিত হলো, মহানবী (সা.) তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক, যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো মা করা হয়নি। ’ (জামেউল উসুল, হাদিস : ১৪১০)
রমজান জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসের প্রথম রজনীর যখন আগমন ঘটে, তখন শয়তান ও অসৎ জিনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, এ মাসে একটি দরজাও খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকেন যে হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী, তুমি অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী, তুমি থেমে যাও! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। (আসসুনান আসসুগরা, হাদিস ১৪২৯)
রমজান মাসে আমলের প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি : হাদিসে এসেছে, রমজান একে সত্তরের মাস। স্বাভাবিকভাবে কোরআন তিলাওয়াতে প্রতিটি হরফে ১০টি নেকি পাওয়া যায়। কিন্তু রমজানের ফজিলতের কারণে তা ৭০ গুণ বৃদ্ধি হয়ে প্রতি হরফে পাওয়া যায় ৭০০ নেকি। সাধারণত নামাজে তিলাওয়াত করলে প্রতি হরফে পাওয়া যায় ১০০ নেকি। রমজানে নামাজে তিলাওয়াত করলে তা ৭০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে সাত হাজার নেকি প্রতি হরফে পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন, না বুঝে কোরআন পড়লে কোনো নেকি পাওয়া যায় না। এ ধারণা একান্তই ভুল। না বুঝে পড়লেও উল্লিখিত নেকি পাওয়া যায়। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এমনিভাবে সব ইবাদত-বন্দেগিসহ সব সৎ কাজের প্রতিদান কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়।
রমজান ধৈর্য ও সবরের মাস : এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিরা খাওয়াদাওয়া, বিয়ে-শাদি ও অন্য সব আচার-আচরণে ধৈর্য ও সবরের এত বেশি অনুশীলন করেন, তা অন্য কোনো মাসে বা অন্য কোনো পর্বে করেন না। এমনিভাবে রোজা পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেওয়া হয়, তা অন্য কোনো ইবাদতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘ধৈর্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেওয়া হবে। ’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ১০)
রমজান ওমরাহ পালনের মাস : রমজানে একটি ওমরাহ আদায় করলে অন্য মাসে ৭০টি ওমরাহ করার সাওয়াব হয়। তাই এ মাসে ওমরাহ আদায় করাটাও অনেক বড় সওয়াবের কাজ। এ প্রসঙ্গে এক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসে ওমরাহ আদায় আমার সঙ্গে হজ আদায়ের সমতুল্য। ’ (মাজমাউল কাবির, হাদিস ৭২২, জামেউল আহাদিস, হাদিস ১৪৩৭৯)