আমার কন্ঠ- ৭১-এর ১১ ডিসেম্বর থেকেই জোর গুজব শোনা যাচ্ছিল, পাকিস্তানি সৈন্যরা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মোটেই উৎসাহী ছিল না এবং প্রয়োজন হলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ও আত্মসমর্পণের জন্যও তারা প্রস্তুত হয়ে আছে। ততক্ষণে এই যুদ্ধে যৌথবাহিনীর বিজয় সম্পর্কে সবাই নিশ্চিত হয়ে গেছে। পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় এবং ধ্বংস অনিবার্য। পূর্ব ফ্রন্টে (আখাউড়া-আশুগঞ্জ-নরসিংদী-ঢাকা) ভারতের ট্যাংক এবং আর্টিলারির কামানগুলো নারায়ণগঞ্জের তারাব এলাকা পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছে। ভারতের ৭৩ ব্রিগেড এবং বাংলাদেশ বাহিনী ঢাকার উত্তরে পূবাইল-টঙ্গী এলাকা থেকে ঢাকা শহরে প্রবেশ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। ডেমরায় প্রস্তুত হয়ে আছে বাংলাদেশ বাহিনী এবং ভারতের ৩১১ ব্রিগেড। ওদিকে, কুমিল্লা থেকে এসে ভারতের ৩০১ ব্রিগেড নারায়ণগঞ্জের কাছে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে পরবর্তী অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষায়। মুক্তিযোদ্ধারা এবং ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনীর অফিসার ও সৈন্য সবাই অস্থির, উদগ্রীব। নিজেদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা এবং যৌথবাহিনী সবারই ধারণা স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ, করণীয় সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অবহিত। তারা শুধু একটি মাত্র নির্দেশের অপেক্ষায়। একটি শব্দের নির্দেশ- চলো। তারপর ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে চূড়ান্ত যুদ্ধে, মুক্ত হয়ে যাবে ঢাকা। কিন্তু এর মধ্যেই ঢাকার মিরপুর এলাকায় ঘটে গেছে কিছু নাটকীয় ঘটনা। সেখানে ভারতের ১০১ ‘কমিউনিকেশন জোনের’ মেজর জেনারেল নাগরা ১৬ ডিসেম্বর সকালে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য নিয়াজিকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন এবং নিয়াজিও ওই মুহূর্তে আত্মসমর্পণ করার জন্য উদগ্রীব। ১৬ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নিয়াজি আত্মসমর্পণের সর্বশেষ মেয়াদ আরও ৬ ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের মানেক শ’র কাছে জরুরি ‘অয়্যারলেস’ বার্তা পাঠিয়ে দেন। সেই সঙ্গে নিয়াজি অনুরোধ জানান, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের শর্তাবলি নির্ধারণ করার জন্য একজন ‘সিনিয়র’ ভারতীয় সামরিক অফিসারকে যেন ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সকাল ১০টায় (১৬ ডিসেম্বর) পাকিস্তানের ৩৬ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জাম্শেদ গাড়িতে করে মিরপুর ব্রিজ এলাকায় তার বাহিনীর অগ্রবর্তী হেড কোয়ার্টারে চলে আসেন। সেখানে ভারতের মেজর জেনারেল নাগরার বার্তা নিয়ে আসা ভারতীয় অফিসাররা জেনারেল নিয়াজির জবাবের অপেক্ষা করছিলেন। মিরপুর ব্রিজ এলাকা থেকে মেজর জেনারেল জামশেদ ভারতীয় অফিসারদের সঙ্গে ভারতের ২ প্যারা ব্যাটালিয়নের অগ্রবর্তী অবস্থানে চলে যান। মেজর জেনারেল জামশেদকে বহনকারী পাকিস্তানিদের গাড়িটি ছিল প্যারা ব্যাটালিয়নের জিপের পেছনেই এবং জেনারেল নিয়াজির সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে জামশেদ যৌথবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। মেজর জেনারেল জামশেদ সেখানে মেজর জেনারেল নাগরার সঙ্গে আত্মসমর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়সমূহ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে মেজর জেনারেল নাগরা তার অন্য অফিসারদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার, ব্রিগেডিয়ার শান্ত সিং এবং আরও কয়েকজন ভারতীয় অফিসারকে নিয়ে জামশেদের সঙ্গে তার ৩৬ ডিভিশন হেড কোয়ার্টারে যান। সেখান থেকে বেলা ১১টার দিকে (১৬ ডিসেম্বর) তাদের নিয়াজির অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। পাকিস্তানের ৩৬ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল জামশেদ আত্মসমর্পণের যে প্রস্তাব নাগরার কাছে দিয়েছিলেন, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানতে পেরে এবং লে. জেনারেল নিয়াজির পাঠানো সর্বশেষ ‘অয়্যারলেস’ বার্তা পাওয়ার পর ভারতের ইস্টার্ন কমান্ড এবং যৌথবাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল অরোরা তার চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকবকে বিমানে করে পাঠিয়ে দেন। ততক্ষণে যৌথবাহিনী মিরপুর ব্রিজ অতিক্রম করে ঢাকা শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। শহরের পথঘাট অনেকটা ফাঁকা। তখন বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের কাছাকাছি।
চরম উত্তেজনায় অস্থির ঢাকা শহরের লোকজন। ট্রাক বোঝাই করে পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন দলে দলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালিয়ে যেতে শুরু করে, তখনই শহরের বিভিন্ন অংশে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় সৈন্যদের স্বাগত জানাতে। বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের বিদ্বেষ এতই প্রচণ্ড ছিল যে, সেই লজ্জাকর পরাজয়ের মুহূর্তেও পলায়নরত পাকিস্তানিরা যেখানেই সুযোগ পেয়েছে, যৌথবাহিনীকে স্বাগত জানানোর জন্য শহরের রাস্তায় বেরিয়ে আসা বাঙালিদের গুলি করে হত্যা করেছে। কিন্তু ততক্ষণে বিদ্যুৎগতিতে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল, মুক্তিযোদ্ধারা এবং ভারতীয় বাহিনী শহরে প্রবেশ করেছে। ‘ওরা এসে গেছে!’ ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে, রাস্তা-ঘাটে, বাসা-বাড়িতে-সর্বত্রই বিদ্যুৎগতিতে সঞ্চারিত এ কয়টি শব্দ শোনা গেল। আর সব কণ্ঠস্বর এই জীবন-সঞ্চারী ধ্বনির কাছে হারিয়ে গেল। কিছু সময়ের জন্য সবাই যেন বাক্শক্তিহীন হয়ে পড়ে। এ অবিশ্বাস্য আনন্দ! নিস্তেজ, স্পন্দনহীন নগরী মুহূর্তে মানুষের বিজয়-উল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি ওঠে, ‘জয় বাংলা’। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!
আত্মসমর্পণের দলিলের একটা খসড়াসহ লে. জেনারেল অরোরার হেড কোয়ার্টার থেকে বেলা ১টায় মেজর জেনারেল জ্যাকব ঢাকায় চলে আসেন বেলা ২টা ৫০ মিনিটে। লে. জেনারেল অরোরা একজন সামরিক কমান্ডারের জীবনের সবচেয়ে আকাক্ষিত, সুন্দর বার্তাটি পেয়ে গেলেন। বার্তাতে বলা হয়, নিয়াজি তার সব বাহিনী নিয়ে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে রাজি আছেন এবং আত্মসমর্পণের দলিলে সই করতে প্রস্তুত। ততক্ষণে পশ্চিম সেক্টরে পাকিস্তানের ৯ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনসারী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। বেলা ৩টার মধ্যে শত শত মুক্তিবাহিনীর সদস্য এবং ভারতীয় আর্মির একটি বিগ্রেড বিজয়ীর বেশে ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার মার্শাল দেওয়ান, ভারতীয় নৌ-বাহিনীর ভাইস অ্যাডমিরাল কৃষ্ণান, ওঠ কোর কমান্ডার লে. জেনারেল সাগত সিং এবং ভারতের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডার ও বাংলাদেশ বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এয়ার কমোডর এ কে খন্দকারকে নিয়ে লে. জেনারেল অরোরা পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য বিমানে করে ঢাকা চলে আসেন।
চট্টগ্রাম শহরের কয়েক মাইল দূরে যুদ্ধরত আমরা ঢাকায় কি ঘটছে সে সম্পর্কে তখন পর্যন্ত সবকিছু জেনে উঠতে পারিনি। রেডিও সংবাদ শুনে শুধু এতটুকু বুঝতে পারছিলাম যে, পাকিস্তানিরা আরও কিছু সময় চেয়েছে এবং সে সময়সীমা উত্তীর্ণ হলে ঢাকা শহরকে মুক্ত করার জন্য তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়ে যাবে। আর এদিকে মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর বঙ্গোপসাগরে উপস্থিত হওয়ার ফলে আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছিল অবিলম্বে চট্টগ্রাম শহরকে মুক্ত করে ফেলতে। ভাটিয়ারিতে আমরা তখন তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত। সমগ্র বাংলাদেশের কোথায় কি ঘটছে সে ব্যাপারে খবর নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি না। উত্তেজনাময় ওই মুহূর্তগুলোতে যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের ধ্বংস এবং চট্টগ্রাম শহর মুক্ত করা ছাড়া আর কিছু ভাববার অবকাশ নেই আমাদের কারও। এমনকি ১৫ ডিসেম্বর ভাটিয়ারির কাছেরই একটি গ্রাম মুক্ত হলে সেই গ্রামেরই ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধাকে আমি ১২ ঘণ্টার ছুটি দিয়েছিলাম গ্রামে গিয়ে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য। ওই কিশোর আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গর্বের সঙ্গে বলল, ‘না স্যার, চট্টগ্রাম শহর মুক্ত হওয়ার পরই আমি বাবা-মা’র সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি যাব, তার আগে নয়।’ ১৬ ডিসেম্বর। বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট। ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায়ই যুদ্ধ থেমে গেছে। সুবেদার আজিজ তার কোম্পানিটি নিয়ে খুব সতর্কতার সঙ্গে ছোট্ট একটা খাল অতিক্রম করছে। ৪টা ৩১ মিনিট। হয়তো ঠিক ওই মুহূর্তেই নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছেন- ঢাকার রেসকোর্স মাঠে। এ সময়ই ১৫০ মাইল দূরে ভাটিয়ারিতে আমাদের সুবেদার আজিজের কোম্পানির মাঝখানে এসে পড়ল পাকিস্তানিদের নিক্ষিপ্ত কামানের গোলা। মারাত্মকভাবে আহত হলো সুবেদার আজিজ এবং ১৫ বছরের সেই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। গোলাগুলি তখনো চলছে। কিছুক্ষণ পরে ভাটিয়ারির ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্রিজটির দক্ষিণ দিক থেকে একজন পাকিস্তানি মেজর একটি সাদা পতাকা উড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে খালের পাড় পর্যন্ত। আমিও এদিক থেকে খালের পাড় পর্যন্ত চলে এলাম। মাঝখানে ভাটিয়ারির সেই বিধ্বস্ত ব্রিজ এবং খাল। পাকিস্তানিদের ওই মেজর আমাকে বলল, তারা নিয়াজির কাছ থেকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ পেয়েছে এবং এখন আত্মসমর্পণ করতে চায়। এমন সময়ই আমার কাছে খবর এলো যে, সুবেদার আজিজ এবং ওই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন ঢলে পড়েছে অনেক দূরে। সেদিনের সন্ধ্যার সেই মুহূর্তে আনন্দ-বেদনা মেশানো এক বিচিত্র অনুভূতি আমার সব দেহমন আচ্ছন্ন করে ফেলে। শ্রান্ত দেহে, ক্লান্ত পদক্ষেপে ফিরে চলি নিজ অবস্থানে- কাল প্রভাতের নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়।