মোহাম্মদ কামাল হোসেন,৩১ অক্টোবর,১৯
চাঁদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আব্দুস সবুর মন্ডল চাঁদপুর জেলা প্রতিটি উপজেলা ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ঐ সময় জেলার সকল সরকারি কর্মকর্তা ও কমচারীদের মাত্র এক দিনের বেতনের টাকায় ভিক্ষুকমুক্ত করা হবে। সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক দিনের বেতনের টাকা সংগ্রহ করেছিলেন । সেই টাকা থেকে হাজীগঞ্জের প্রায় দেড়শ’ ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করায় গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ভিক্ষুককমুক্ত করা হয়েছে হাজীগঞ্জ উপজেলাকে। এর আগে অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করণের উদ্বোধন করেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বৈশাখী বড়ুয়ার তত্ত্বাবধানে উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পর্যায়ক্রমে তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়নকে ভিক্ষুক মুক্ত করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর জেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করণের লক্ষ্যে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (বর্তমানে যুগ্ম-সচিব) আব্দুস সবুর মন্ডল উদ্যোগ নেন। সে উদ্যোগের আলোকে সে সময় জেলার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক দিনের বেতনের টাকা সংগ্রহ করে তহবিল গঠন করেন। সে তহবিল থেকে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের প্রথম প্রক্রিয়া শুরু হয় হাজীগঞ্জ থেকে।
উপজেলার রাজারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল হাদী জানিয়েছেন, আমরা জনপ্রতিনিধিগণ আগে আমাদের নিজ নিজ এলাকা থেকে যারা ভিক্ষা করে তাদেরকে চিহ্নিত করি। এর পরেই তাদেরকে পুনর্বাসন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে জরিপ করা হয়। জরিপে যেসব ভিক্ষুকের নাম এসেছে শুধুমাত্র তাদেরকে নিয়ে তালিকা করা হয়। সে তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেয়ার পর উনি ওই তালিকা উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের দিয়ে যাচাই-বাছাই করেন। সে তালিকার সূত্র ধরেই ভিক্ষুকদেরকে পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করা হয়।
উপজেলার ৬নং সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ কবির হোসেন জানিয়েছেন, পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্ত ভিক্ষুকদের সাথে কথা বলে যে যেই কাজে দক্ষ তাকে সে হিসেবে পুনর্বাসনের রূপরেখা তৈরি করা হয়। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে কিছু ভিক্ষুককে ঘর, ব্যবসা করার জন্য ওজন মেশিন, ঘর করার জন্য পর্যাপ্ত টিন এবং বিভিন্ন প্রকার ভাতা প্রদান করে পুনর্বাসন করা হয়। ২য় পর্যায়ে ভিক্ষুকদের রিকশা, ভ্যান গাড়ি, সেলাই মেশিন, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় প্রায় ১শ’ ভিক্ষুককে বিভিন্ন উপকরণ, ভাতা ও ঘর বিতরণের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা হয়। ২য় পর্যায়ে উপজেলার ১টি পৌরসভাসহ ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ২শ’ ভিক্ষুককে পুর্নবাসনের উপকরণ দেয়া হয়।
গত ১৩ অক্টোবর উপজেলার রাজারগাঁও ইউনিয়নে ২৮জন ও বাকিলা ইউনিয়নের ১৩জনসহ ওইদিন ৪১জন ভিক্ষুককে উপকরণ তুলে দিয়ে উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্তকরণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম।
এরপর পর্যায়ক্রমে উপজেলার কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নে ১৫জন, কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নে ১০জন, গন্ধর্ব্যপুর উত্তর ইউনিয়নে ৯ জন, হাটিলা পশ্চিম ইউনিয়নে ১৪ জন ও সদর ইউনিয়নে ২৫ জন, হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নে ১০ জন ও দ্বাদশ গ্রাম ইউনিয়নে ১৩জন, বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নে ৪ জন, বড়কুল পশ্চিম ইউনিয়নে ৮ জন ও গন্ধর্ব্যপুর দক্ষিণ ইউনিয়নে ১১ জনকে পুর্নবাসনের উপকরণ প্রদান শেষে স্ব-স্ব ইউনিয়নকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার পৌরসভার ৩৭জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের উপকরণ প্রদান করে হাজীগঞ্জ উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করছেন জেলা প্রশাসক মোঃ মাজেদুর রহমান খান। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পৌর মেয়র আ.স.ম মাহবুব উল আলম লিপন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বৈশাখী বড়ুয়া।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বৈশাখী বড়ুয়া জানিয়েছেন, যারা পুনর্বাসিত হচ্ছে তাদের কর্মকান্ড নিয়মিত মনিটরিং করার জন্যে ইউপি চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে। ভিক্ষুকদের চাহিদা সম্পর্কে জেনেছি এবং তাদের চাহিদা অনুযায়ী উপকরণ বিতরণের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সমাজে প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে একটি পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ার। যারা পুনর্বাসিত হচ্ছে তারা যদি আত্মসম্মানবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সদিচ্ছাকে মনের মাঝে জাগ্রত করে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সংসার চালায়, তাহলেই আমাদের এ উদ্যোগ সার্থক হবে।