নিয়তির নির্মম পরিহাস
চৌধুরী ইয়াসিন ইকরাম ॥
নিয়তির পরিহাস বলে কোন জিনিস আছে বলে বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ না মানলেও চাঁদপুর শহরের বাসষ্ট্যান্ড চক্ষু হাসপাতাল লাগোয়া বিষ্ণুদি এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের প্রধানিয়ার জীবনে যা ঘটছে তাকে নিয়তির নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কী বলা যায়? তা অনেকেরই বোধগম্য নয়।
গত বুধবার সকালে তার বাবা আঃ রশিদ প্রধানিয়া মারা যান। স্ত্রী ও দু’কন্যাকে নিয়ে তিনি বাবার মরদেহ সমেত চলে যান তার গ্রামের বাড়ি বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ধনপর্দ্দি গ্রামে দাফন করার জন্য। সেদিনই রাতে তাকে সমাহিত করা হয় প্রধানিয়া বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানে। শুক্রবার বাদ জুমা বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বাড়ির মসজিদে দোয়া অনুষ্ঠান শেষ করতে না করতেই খবর পান লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত একমাত্র ছোট ভাই জাকির হোসেন প্রধানিয়ার (৪৫) অবস্থা সংকটাপন্ন। ছুটে আসেন চাঁদপুর শহরের শের ই বাংলা ছাত্রাবাসের পেছনে অবস্থিত নিজের বাসায়। দ্বিতল বিশিষ্ট ওই বাসার নিচ তলায় অবস্থিত নিজের ঘরে না প্রবেশ করে স্ত্রী ষোলঘর উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষিকা ফরিদা আক্তারসহ সোজা চলে যান ছোট ভাইয়ের ঘরে দ্বিতীয় তলায়। সেখানে পৌঁছতে না পৌঁছতেই ছোট ভাই জাকির মারা যায়। শোকে কাতর তাহের চোখ মুছতে মুছতে নিচে নেমে এসে নিজের বাসার প্রধান গেটের তালা খুলে ঘরের প্রবেশদ্বারে যেতেই চোখ ছানাভরা। দেখেন দরজার তালা ভাঙ্গা। নিচে পড়ে আছে কড়ার অংশ, এক জোড়া সেন্ডেল। দ্রুত ঘরে প্রবেশ করে দেখেন ঘরের সব আলমিরা খোলা, কাপর-চোপরসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পড়ে আছে এদিক সেদিক। সামনের রুমে থাকা এলসিডি টিভি এবং ভেতরের রুমে থাকা রঙ্গিন টিভি -কিছুই নেই। তাৎক্ষণিক যাচাই করে জানা গেল, ঘরে থাকা নগদ প্রায় ৩ লাখ টাকা, ছোট বোনের বিদেশ ফেরত স্বামীর গচ্ছিত রাখা প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলার, প্রায় ৮ ভড়ি সোনার অলংকার, মূল্যবান কাপড়-চোপড় নেই। সাথে রয়েছে দরকারি ও জরুরি বেশ কিছু কাগজ-পত্রও। চোরের দল শোকেস থেকে পারফিউমগুলো পর্যন্ত নিয়ে গেছে। দরজার পরদা খুলে সেগুলোতে পেঁচিয়ে মালামালগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। উপর তলায় ভাইয়ের লাশ, নিচতলায় এই অবস্থা, তার সাথে মাত্র দু’দিন আগে বাবা হারানোর ব্যাথা- সব মিলিয়ে পাগলপ্রায় অবস্থা। খবর পেয়ে তার আতœীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশিরা ছুটে আসে এবং তাকে শান্ত্বনা দেবার প্রয়াস চালায়। খবর দেয়া হয় পুলিশে। চাঁদপুর সদর মডেল থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে যান। কিন্তু ঘরের এই অবস্থা রেখেই তাহেরকে ছুটতে হয় ভাইয়ের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে। রাতেই আদরের ছোট ভাইকে সমাহিত করা হয় দু’দিন আগে মারা যাওয়া বাবার কবরের পাশে। তাহের এখন বাকরুদ্ধ। সাথে তার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষয়িত্রী বৃদ্ধা ও অসুস্থ্য মা জাহানারা বেগমও একেবারে ভেঙ্গে পড়েছেন। এখন তাকে নিয়ে চলছে জমে-মানুষে টানাটানি।
