শ্রমিকদের উৎসব ভাতা বা বোনাস দেওয়ার বিষয়ে শ্রম আইনে একটি শব্দও নেই। গত বছরের শেষ দিকে ঘোষিত নিম্নতম মজুরি কাঠামোতেও এ বিষয়ে কিছু বলা নেই। পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএরও নেই কোনো নিজস্ব নিয়মকানুন। এ কারণেই মালিকপক্ষ ভাতা হিসেবে যা দেয় তাই নিয়েই শ্রমিকদের খুশি থাকতে হয়।
কয়েক বছর ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, এতেও একটি ‘কিন্তু’ আছে। ঈদের আগে কার্যাদেশ কম, লোকসানসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে পোশাকশিল্পের মালিকদের একটি অংশ বেতন-ভাতা দেওয়ার বিষয়ে টালবাহানা শুরু করে। এ জন্যই প্রত্যেক ঈদের আগেই পোশাকশিল্পে শুরু হয় অস্থিরতা। একপর্যায়ে দাবি আদায়ে রাস্তায় নামেন হাজার হাজার শ্রমিক। চাপে পড়ে সরকার বেতন দিতে একটি সময় বেঁধে দেয় মালিকদের, তবে বোনাস নিয়ে সুনিদিষ্ট করে কিছু বলতে দেখা যায় না। শেষ পর্যন্ত অনেক শ্রমিকই বেতন-বোনাস ছাড়াই ঈদ করতে বাধ্য হন।
এ ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ তোবা গ্রুপ। তিন মাসের বেতন, ওভারটাইম ও ঈদ বোনাস না পেয়ে গত ঈদুল ফিতরের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছিল তোবার উত্তর বাড্ডার পাঁচ কারখানার পোশাকশ্রমিকদের। তাঁরা ঈদের আগের দিন গত ২৮ জুলাই থেকে শুরু করে অনশন করেছেন টানা ১১ দিন। পরে ৬ ও ৭ আগস্ট দুই মাস এবং ১০ আগস্ট এক মাসের বকেয়া মজুরি পান। তবে এখনো ঈদের বোনাস পাননি তোবার শ্রমিকেরা। কবে পাবেন, সেটিরও নিশ্চয়তা নেই। ইতিমধ্যে মালিক কারখানাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন।
অবশ্য শুধু যে তোবার শ্রমিকেরা পাননি, তা নয়। গত ঈদের আগে ৬ শতাংশ কারখানার শ্রমিকেরা বেতন-ভাতা পাননি। এর মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে ঠিকা বা সাব-কন্ট্রাকে কাজ করে এমন কারখানা। গত ২৭ জুলাই শিল্প পুলিশ এমন তথ্য দিয়ে জানায়, সারা দেশে তিন হাজার ৬৫৫ পোশাক কারখানার মধ্যে আশুলিয়া-সাভার এলাকার ৪৮, গাজীপুরের ৭৪, নারায়ণগঞ্জের ২১ এবং চট্টগ্রামের ৫৩ কারখানায় জুলাই মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস দেয়নি। অবশ্য বিজিএমইএর দাবি, তাদের সব সদস্য কারখানা সময়মতোই বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে।
এ বছর জুলাই মাসে ঈদুল ফিতরের আগে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-বোনাস বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের ৩০০ পোশাক কারখানায় জরিপ করেছিল। সেই জরিপে দেখা যায়, ৮৫ শতাংশ কারখানার মালিকই তখন পর্যন্ত (৭ জুলাই, ২০১৪) জুলাই মাসের বেতন ও ঈদের বোনাস দেওয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের আশ্বাস দেননি। আর বাকি ১৫ শতাংশ কারখানার মালিকপক্ষ বলছে, মাসের ১০ থেকে ১৫ দিনের বেতন ও বোনাস হিসেবে মূল বেতনের ৪০-৪৫ শতাংশ দেবে।
আবার শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের চলতি মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে পুরো মাসের বেতন দেওয়া হবে কি না, কত ভাগ বোনাস দেওয়া হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় পরিষ্কার করে কিছু না বলায় পুরো বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকরা বড় ধরনের দ্বিধার মধ্যে পড়ে যায়।
শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও শ্রমিকনেতারা জানান, ঈদের আগে যেসব কারখানা বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে, তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ কারখানা বেতন দিলেও বোনাস দেয়নি। আবার বোনাস দিলেও ওভারটাইম দেয়নি। অন্যদিকে হাতে গোনা কয়েকটি বড় কারখানা পুরো মাসের বেতন ও মূল বেতনের শতভাগ বোনাস দিয়েছে। তবে মাঝারি ও ছোট কারখানার মালিকেরা যত টাকা বোনাস দিয়ে আপস করাতে পারছেন, তাই দিয়েছেন। এটি আবার মূল বেতনের ২০ থেকে শুরু করে ৪০ শতাংশের বেশি নয়।
জানা যায়, গত বছরের ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন)-২০১৩ বিল পাস হয়। এই বিল পাসের আগে গণশুনািনর আয়োজন করে শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সংসদীয় কমিটি। এ সময় শ্রমিকনেতা ও শ্রম বিশেষজ্ঞরা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি উৎসব ভাতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করেন। তবে শ্রম আইন-২০০৬-এ বেশকিছু পরিবর্তন পরিমার্জন আনা হলেও ভাতার বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যায়।
জানতে চাইলে শ্রমসচিব মিকাইল শিপার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, আইন সংশোধনের সময় বোনাস বিষয়টি যুক্ত করার দাবি এসেছিল। তবে এটি অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। কারণ, শ্রম আইন শুধু পোশাকশিল্পের জন্য নয়। অন্য শিল্পের পাশাপাশি দোকানের কর্মচারীরাও এই আইনের আওতায় পড়েন। ফলে এটি বাস্তবায়ন করা অনেক ক্ষেত্রেই মুশকিল।
এ ছাড়া গত বছর পোশাকশিল্পের জন্য গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির দেওয়া প্রস্তাবে শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য বছরে দুটি উৎসব ভাতার দাবি জানানো হয়। এতে বলা হয়, প্রতি উৎসবে ছয় মাসের বেশি চাকরির ক্ষেত্রে এক মাসের মূল মজুরির হারে এবং ছয় মাসের কম সময়ের চাকরির ক্ষেত্রে ১৫ দিনের মজুরি হারে উৎসব ভাতা পাবেন। তবে মালিকপক্ষ এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামোতে শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু রাখা হয়নি।
এ বিষয়ে ওই মজুরি বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ও জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, উৎসব ভাতার বিষয়ে মালিকপক্ষ তীব্র আপত্তি করে। তা ছাড়া মজুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেহেতু শ্রম আইনে এ বিষয়ে কিছু বলা নেই সে জন্য ‘বোনাস’ বিষয়টি যুক্ত করা আইনসম্মত হবে না।
পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন শ্রমিকনেতা জানান, উৎসব ভাতার বিষয়টি আইনি কাঠামোর ভেতরে আসুক মালিকপক্ষ কখনোই সেটা চায় না। কারণ, এটি হলে মালিকদের দিতে বাধ্য থাকতে হবে। আর না হওয়ায় পুরো বিষয়টি মালিকদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। আইনগত ভিত্তি না থাকায় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে শক্ত করে বলার কিছু থাকে না। সে জন্যই উৎসব ভাতার বিষয়টি আইন আকারে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেই সরকারের উচ্চ মহলে তদবির শুরু করেন মালিকপক্ষের লোকজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএর একজন সাবেক ও একজন বর্তমান নেতা এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করে বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকেরা চান না বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যে আসুক।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, মালিকেরা ঈদের আগে সরকারের কাছ থেকে ৮০০ কোটি টাকা প্রণোদনা নিয়েছেন। কিন্তু শ্রমিকদের বোনাস দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের এই কার্পণ্য মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সব রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বোনাস দেওয়ার বিষয়টি প্রজ্ঞাপন আকারে নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। ফলে পোশাকশিল্পেও এমন কিছু করা দরকার।
জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, বোনাস দেওয়ার বিষয়টি রেওয়াজ হয়ে গেছে। এখন তো সব মালিককেই বাধ্যতামূলক দিতে হয়।
তাহলে বোনাসকে আইনি কাঠামোর আনতে সমস্যা কোথায়, এমন প্রশ্নের জবাবে আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘উদ্যোক্তারা লাভবান হলে বোনাস দিবে, না হলে দিবে না। আইন করা হলে মালিকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হবে। তবে সরকার যদি এ ধরনের কোনো আইন করে, আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়।’
এ বিষয়ে সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘লাভ-লোকসানের সঙ্গে উৎসব ভাতার সম্পর্ক নাই। এটি নিয়মিত বিষয়। বরং লাভ-লোকসানের সঙ্গে সম্পর্ক আছে উৎসাহ ভাতার। এটি কিছু ব্যাংক ও হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান পালন করে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, শিগগিরই বিষয়টির সমাধান না করলে আসছে কোরবানির ঈদেও বোনাস নিয়ে জটিলতা থেকেই যাবে।
শ্রমসচিব মিকাইল শিপার বলেন, বর্তমানে শ্রম আইনে ‘উৎসব ভাতা’ যুক্ত করার চিন্তাভাবনা নেই। তবে পরবর্তী সময়ে যে হবে না, তা নয়।
শ্রমিকদের ‘ঠকানো’ বন্ধে কোনো দিক থেকেই কোনো উদ্যোগ নেই
