জিসান আহমেদ নান্নু কচুয়া-
আনোয়ার হোসেন (৭৭)। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আনোয়ার হোসেন কচুয়া উপজেলার ৪নং পূর্ব সহদেবপুর ইউনিয়নের ভূইয়ারা গ্রামের মৃত আলী আকবর মিয়ার ছেলে। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন তৎকালীন ১৯৭১সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে দেশ ও দেশের মানুষের ভালোবাসা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আনোয়ার হোসেন জানান, তখন তিনি সিংআড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সদ্য এসএসসি পাশ করে মতলব ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন। পাক্তিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশে মা বোন ও সাধারণ মানুষের উপর চরম নির্যাতন নিপীরন শুরু করলে তিনি বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে বাবা-মা ও পরিবারের কাউকে না বলেই সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
দেশে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হলে ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে রাইফেল গ্রেনেড প্রশিক্ষন নিয়ে কচুয়া উপজেলার উত্তর মধুপুর ২নং সেক্টরে পরবর্তীতে মতলব দক্ষিন উপজেলার চেঙ্গাতলী এলাকায় সাহসীকতার সাথে যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তার সঙ্গী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন (মেঘদাইর), শাহজাহান (বক্সগঞ্জ), মোঃ আব্দুল হানিফ (সাদিপুরা চাঁদপুর) ও মফিজুর রহমান (ডুমরিয়া)সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। তাদের অধিনায়ক হিসেবে বাংলাদেশ মুক্তিফ্রন্ট কচুয়া থানা বিএলএফ (যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান) মোঃ ওয়াহিদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করায় একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তৎকালীন বিএলএফ (যুদ্ধকালীন কমান্ডার) মোঃ ওয়াহিদুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারী আনোয়ার হোসেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী একজন সৈনিক হিসেবে একটি সনদপত্র প্রদান করেন। যার ক্রমিক নং ৪২, তারিখ ২৫-০২-১৯৭২ইং। সনপত্রে উল্লেখ করা হয়, আনোয়ার হোসেন, পিতা মোঃ আলী আকবর প্রধান, গ্রাম ভূইয়া, ডাকঘর পালাখাল, থানা কচুয়া, জেলা কুমিল্লা। বাংলাদেশের একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাহার সংগ্রামী ভূমিকায় জাতী গৌরবান্বিত। তিনি আমাদের সংগঠনের একজন সদস্য। মাতৃভূমির সেবায় তাঁহার জীবন উৎস্বর্গীত হউক। আমি তার জীবনের সাফল্য কামনা করি।
অপরদিকে ২০১০ সালে আনোয়ার হোসেন কচুয়া থানার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাচাই ফরম পূরণের পরেও তার নাম প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অর্ন্তভূক্ত হয়নি ও সম্মানীভাতা পায়নি। বর্তমানে তার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার ঠাই পাইনি। বরং যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি তাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সরকারের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করছে। মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
সরে জমিনে দেখা গেছে, আনোয়ার হোসেন জীবন জীবিকার তাগিতে বর্তমানে বাড়ির পার্শ্ববর্তী পালাখাল বাজারে আব্দুল মালেক নামের জনৈক এক ব্যাক্তির দোকানে বৃদ্ধ বয়সে মাসিক ৩ হাজার টাকা বেতনে চাকুরি করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুক্তিযোদ্ধা জানান, আনোয়ার হোসেনের দরখাস্তের অনুকুলে মন্ত্রনালয়ের প্রেরিত ১২৯ জনের তালিকায় ক্রমিক নং ১০৮। এটি প্রক্রিয়াগত ভূলত্র“টি বলে আমি মনে করি।
এ ব্যাপারে কচুয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মোঃ জাবের মিয়া জানান, আনোয়ার হোসেন মুক্তিযোদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। তবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে থাকলে অনলাইনে আবেদন পূরণ করতে পারেন।
এদিকে আনোয়ার হোসেন মৃত্যুর পূর্বে তার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অর্ন্তভূক্ত ও যাবতীয় সুযোগ সুবিধা পেতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হকের সৃ-দৃষ্টি কামনা করেছেন।
