চৌধুরী ইয়াসিন ইকরাম, চাঁদপুর থেকে ॥ অবশেষে ন’বছর পর চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলো। নির্বাচন আগামী ২৯ মার্চ রোববার। গত ১৫ ফেব্র“য়ারী রোববার নির্বাচন কমিশন চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের পুনঃ তফসিল ঘোষণা করেন। আর এটি হচ্ছে এ পৌর নির্বাচনের তৃতীয় দফা তফসিল। সব আইনি জটিলতা শেষ করে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন এই তফসিল ঘোষণা করেছে। তাই এখন আর শতোর্ধ্ব বয়সী ঐতিহ্যবাহী চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচন হতে আইনী কোনো বাধা নেই। চাঁদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আতাউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোঃ ফরহাদ হোসেনের স্বাক্ষরিত এ প্রজ্ঞাপনটিও চাঁদপুর এসে পৌঁছেছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ি মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৬ ফেব্র“য়ারি বৃহস্পতিবার, মনোনয়নপত্র বাছাই ১ মার্চ রোববার, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১০ মার্চ মঙ্গলবার এবং প্রতীক বরাদ্দ ১১ মার্চ বুধবার। আর ভোট গ্রহণ হবে ২৯ মার্চ রোববার। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, ইতিপূর্বে অর্থাৎ ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর যারা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তাদের মনোনয়ন বহাল থাকবে। অর্থাৎ ওইসব প্রার্থীর আর নূতন করে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে না। শুধুমাত্র নূতন করে কেউ যদি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান তাদের জন্য এই পুনঃ তফসিল তথা মনোনয়নপত্র দাখিলসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ থাকবে। এই পুনঃ তফসিলে মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই ও প্রত্যাহারের দিন-তারিখ শেষ হওয়ার পর আগের প্রার্থীদের সাথে নূতন প্রার্থী তালিকা যোগ হয়ে চূড়ান্ত হবে প্রার্থী তালিকা।
২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করেছিলো সে তফসিল অনুযায়ী ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর ছিলো মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। ওই সময় মেয়র পদে ৯ জন এবং কাউন্সিলর পদে ১৩৭ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কাউন্সিলর পদে ১৩৭ জনের মধ্যে সাধারণ ওয়ার্ডে ১০৬ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে হচ্ছে ৩১ জন। এসব প্রার্থীর মাঝে প্রতীকও বরাদ্দ দেয়া হয়। মেয়র পদে যারা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন তারা হচ্ছেন, বর্তমান মেয়র নাছির উদ্দিন আহম্মেদ (আওয়ামী লীগ), পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি’র সাবেক নেতা শফিকুর রহমান ভ্ইূঁয়া, অ্যাডঃ ইকবাল-বিন-বাশার (স্বতন্ত্র), আক্তার হোসেন মাঝি (বিএনপি), অ্যাডঃ আবদুল লতিফ শেখ (জাতীয় পার্টি), শওকত আখন্দ আলমগীর (জাতীয় পার্টি), মাওঃ আঃ রহিম পাটওয়ারী (জামায়াত), এসএম জয়নাল আবেদীন (স্বেচ্ছাসেবক লীগ) ও কামরুল ইসলাম (গণফোরাম)।
মামলার কারণে ঝুলে যাওয়া চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের সর্বশেষ ফয়সালা ছিলো হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করা। চাঁদপুর জেলার হালনাগাদ ভোটার তালিকার খসড়া এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ জানুয়ারিতে হয়ে গেছে। তাই আর কোনো আইনি বাধা বা জটিলতা না থাকায় নির্বাচন কমিশন রোববার চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের পুনঃ তফসিল ঘোষণা করে। এর আগে ২০১০ সালে কমিশন এই পৌরসভা নির্বাচনের দুই দফা তফসিল ঘোষণা করেছিল। চার বছর পর কমিশন সব প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা শেষ করে রোববার তফসিল ঘোষণা করে।
মেয়াদ পূর্ণ হবার আগেই চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিলো ২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর। তখন দেশের ২৬৯টি পৌরসভার সাথে চাঁদপুরের ৭টি পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এ সাতটি হচ্ছে : চাঁদপুর, শাহরাস্তি, মতলব, ছেঙ্গারচর, হাজীগঞ্জ, কচুয়া ও ফরিদগঞ্জ। ১৮ জানুয়ারি ২০১১খ্রিঃ ছিলো ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ভোট গ্রহণের দিন। তবে এ সাতটি পৌরসভার মধ্যে ৬টি পৌরসভার মেয়াদ শেষ হলেও চাঁদপুর পৌরসভার মেয়াদ তখনো ছিলো। তখন চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও জেলা নির্বাচন অফিস নির্বাচনের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না। অর্থাৎ পৌরসভার সীমানা বৃদ্ধির পর সবেমাত্র ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস হয়েছে। কিন্তু ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাস হয়নি, ভোটার তালিকা মুদ্রণ হয়নি এবং হালনাগাদ করা হয়নি। এসব কারণে তখন চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচন হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। জেলা নির্বাচন অফিসও তখন নির্বাচন কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেয় তাদের অপ্রস্তুতির বিষয়। এসব যৌক্তিক কারণে ১৮ জানুয়ারি ২০১১খ্রিঃ তারিখে চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচন হওয়া না হওয়া নিয়ে পৌরবাসী যখন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলো, তখন ওই বছরই অর্থাৎ ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর পৌরসভার জনৈক ভোটার ভোটার তালিকা হালনাগাদ না করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ায় হাইকোর্টে একটি রিট করেন। হাইকোর্ট ওই দিনই চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচনের উপর ৩ মাসের স্থগিতাদেশ দেন। এদিকে হাইকোর্টের এ স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে মেয়র প্রার্থী শফিকুর রহমান ভূঁইয়া চেম্বার জজ আদালতে আপিল করলে চেম্বার জজ হাইকোর্টের ওই স্থগিতাদেশ ৬ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে। এরপর ২১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের পুনঃতফসিল ঘোষণা করে। এ পুনঃ তফসিল অনুযায়ী ২৭ জানুয়ারি ২০১১ ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়। এই পুনঃ তফসিল অনুযায়ী ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর মেয়র পদে ৯ জন ও কাউন্সিলর পদে ১৩৭ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এদিকে ২৯ ডিসেম্বর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও এই তফসিলেও নির্বাচন হওয়া না হওয়া নিয়ে সংশয় কাটেনি। কারণ, চেম্বার জজ আদালতের ৬ সপ্তাহের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে ১২ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম রিটকারী পুনরায় ২১ ডিসেম্বর লীভ টু আপীল করেন। তার এই লীভ টু আপীলের শুনানি শেষে ১০ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে সুপ্রীম কোর্ট ৩১ জানুয়ারি ২০১১ পর্যন্ত চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচন স্থগিত করে। ফলে দ্বিতীয় দফা তফসিলেও নির্বাচন হয়নি। অপরদিকে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি জনৈক ভোটার চাঁদপুর পৌরসভাকে কেনো সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হবে না মর্মে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। এমনিভাবে আপিল পাল্টা আপিল চলতে থাকায় চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচন আদালতের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এরপর সর্বশেষ উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দেয় যে, হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচন করতে হবে। অবশেষে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সময়ের মধ্যেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলো কমিশন।
এদিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সাথে সাথেই প্রার্থীরা নড়েচড়ে উঠেছেন। আগের প্রার্থীদের সাথে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নতুন করে যোগ হতে যাচ্ছেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিমউদ্দিন পাটওয়ারী, জেলা বিএনপি’র ১ নম্বর যুগ্ম আহবায়ক অ্যাডভোকেট সলিমুল্লা সেলিম, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সভাপতি, চাঁদপুর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ এর সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর খান, জেলা ছাত্রদলের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইব্রাহিম কাজী জুয়েল, জেলা যুবদলের সভাপতি শাহাজাহাল মিশন। ইতি মধ্যে প্রার্থীরা মনোয়নপত্র সংগ্রহ শুরু করেছে।
