চৌধুরী ইয়াসিন ইকরাম, চাঁদপুর থেকে
টানা অবরোধ আর হরতালে প্রচীন নদী বন্দর চাঁদপুরের ব্যবসা বাণিজ্যে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। অব্যাহত লোকসানের মুখে এখানকার ব্যবসায়ীরা।
সড়ক, নৌ ও রেল পথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চাঁদপুরে ব্যবসা বাণিজ্য এমনিতেই বেশ জমজমাট। লক্ষীপুর, শরিয়তপুর, ভোলা ও বরিশালের পন্যের চাহিদা মিটানো হয় চাঁদপুর থেকেই। এ জন্য জেলার নতুন বাজার, পুরানবাজার ও হাজিগঞ্জে রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য পাইকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আড়ৎ। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় এখন কোন ব্যবসা বাণিজ্য নেই বললেই চলে। হরতাল আর টানা অবরোধে নাশকতার আশংকায় আশ পাশের জেলাগুলোতো দুরে থাক স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আসছে না পণ্য কেনা-বেঁচার জন্যে । এ জন্য ব্যবসায়ীদের সাথে দুর্ভোগে পড়েছে কয়েক হাজার শ্রমিকও। রাজনৈতিক অস্থিরতায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লাভ করাতো দূরে থাক এখন নিজেদের ব্যবসার মূলধন হারানোর ভয়ে শঙ্কিত এখানকার ব্যবসায়ীরা। চাঁদপুর চেম্বার অব কর্মাসের পরিসংখ্যানে নাশকতা আর টানা অবরোধে রাজনৈতিক অস্থিরতায় শুধু পুরাণ বাজারে প্রতিদিন লেনদেন কমেছে দেড় থেকে দুইশ কোটি টাকার উপরে। ব্যবসায়িদের নেতা আলহাজ জাহাঙ্গির আখন্দ সেলিম বললেন, আর সহ্য করা যাচ্ছে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কতদিন এভাবে লোকসান গুনবো? দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহনের দাবি চাঁদপুরের ব্যবসায়ীদের।
এদিকে টানা অবরোধে স্থবির হয়ে আছে চাঁদপুরের পরিবহন সেক্টর। ঘুরছে না গাড়ির চাকা তাই বন্ধ শ্রমিকদের আয় রুজি। অর্ধাহারে অনাহারে কাটছে পরিবহন শ্রমিকদের দিন। সেই সাথে প্রতিদিনই পরিবহন মালিকদের লোকসানের পাল্লা ভারি হচ্ছে । একদিনের অবরোধে শুধুমাত্র চাঁদপুরের পরিবহন সেক্টরে মালিকদের লোকসান হয় অর্ধকোটি টাকা।
বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, শরীয়তপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভন্ন অঞ্চলের মানুষ চাঁদপুর হয়ে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম-সিলেট-কুমিল্লায় সহজে যাতায়াত করতে পারে। স্বল্প দূরত্ব এবং নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় চাঁদপুরে যানবাহনও বেশি। কিন্তু টানা অবরোধে এ জেলা থেকে যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভোগ নেমে এসেছে ৪ হাজার পরিবহন শ্রমিকের জীবনে। তারা এখন অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। চাঁদপুর পৌর বাসষ্ট্যান্ড এখন জনমানব শূণ্য। শ্রমিক নেতা আনোয়ার হোসেন মুন্সি জানালেন, অবরোধের কারণে বেকার পরিবহন শ্রমিকরা বাস মালিক কিংবা সরকার কারো পক্ষ থেকেই পাচ্ছে না কোন সহায়তা।
বাস মালিক মফিজউদ্দিন সরকার জানালেন, চাঁদপুরেই দূরপাল্লার ৪৫০টি যাত্রীবাহী বাস চলাচল রয়েছে বন্ধ রয়েছে। সাবেক ফুটবলার ও বাস মালিক টুটুল চৌধুরী জানালেন, সড়ক পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বাস চালাতে পারছে না। যেভাবে গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা ও ককটেল মারা হচ্ছে তাতে করে যাত্রীরাও বাসে চড়তে ভয় পাচ্ছে।
চাঁদপুরে গরম কাপড়রের ভ্রাম্যমান দোকানগুলোতেও পড়েছে হরতাল-অবরোধের প্রভাব। মাঘের শেষ দিকে এসে শীতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়লেও ক্রেতা নেই ভ্রাম্যমান গরম কাপড়ের দোকানে। হরতাল-অবরোধে ক্রেতা সংকট সপিং মলেও। এমন শীতে ক্রেতা নেই, তাই অলস সময় কাটাচ্ছেন অনেকে। এদিকে হতদরিদ্র, দিনমজুর ও নিম্ন বিত্ত ও চরাঞ্চলের মানুষগুলোর পাশে এখনো সরকারি-বেসরকারি, ধনাট্য ব্যক্তিরা সহায়তার হাত বাড়ায়নি। তাই, দু একজন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আসছেন ভ্রাম্যমান গরম কাপড়রের দোকানে।
চাঁদপুর বস্ত্র ব্যবসায়ি মালিক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বাবুল জানালেন, বড় বড় শপিং মল ও মার্কেটগুলোতেও দেখা দিয়েছে ক্রেতা সংকট। এ কারণে লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বেঁচা-বিক্রি না থাকলেও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল তো ঠিকই দিতে হচ্ছে। অনেকে ব্যাংক ও অর্থ লগ্নিকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া সুদে টাকা ধার এনে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। ব্যবসা না থাকলেও তাদের সুদ ঠিকই গুণতে হচ্ছে।
হরতাল অবরোধের কারণে কষ্ট পাচ্ছেন যেমনি নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তেমনি ব্যবসায়ীরাও। এমন রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ব্যবস্থা নেবেন দেশের নীতি নির্ধারকরা, চাঁদপুরবাসীর এমনটাই প্রত্যাশা।
